recent posts

সদ্য প্রকাশিত

মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবের অভিযোগ ও প্রকৃত রহস্য

 মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবের অভিযোগ ও প্রকৃত রহস্য

আহলে হাদীস ভাইদের পরিচিত মুখ ও লেখক জনাব মুযাফফর বিন মুহসিন তার ‘তারাবীহর রাকাআত সংখ্যা’ বইয়ে ‘হাদীস বিকৃতির দুঃসাহস’ উপশিরোনাম দিয়ে লেখেছেন,
হাদীসের প্রধান ছয়টি গ্রন্থে ২০ রাকাআতের কোন হাদীস নেই। অথচ আবু দাউদের উদ্ধৃতি পেশ করা হয়ে থাকে। কারণ হল, দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শায়খুল হিন্দ নামে খ্যাত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (১২৩৮-১৩৩৮ হি.) সুনানে আবু দাউদের একটি হাদীসের শব্দ পরিবর্তন করেছেন। যদিও হাদীসটি ইমাম আবু দাউদসহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের নিকট যঈফ।
মূল হাদীসটি হল-
عَنِ الْحَسَنِ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، فَكَانَ يُصَلِّي لَهُمْ عِشْرِينَ لَيْلَةً...
হাসান থেকে বর্ণিত, উমর রা. উবাই ইবনে কা’বের মাধ্যমে লোকদের একত্রিত করেন। অতপর তিনি তাদেরকে ২০ রাত্রি সালাত আদায় করান।
উক্ত হাদীসের টীকায় মাওলানা মাহমুদুল হাসান নিজের পক্ষ থেকে শব্দ তৈরি করে বলেছেন, অন্য বর্ণনায় عشرين ركعة ‘বিশ রাকাআত’ রয়েছে। এই বিকৃত শব্দেই দিল্লী ‘মুজতাবাঈ প্রেস’ আবু দাউদ ছাপায়।
প্রকৃত রহস্য:
প্রথমত:
শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ. নিজের পক্ষ থেকে শব্দ পরিবর্তন বা তৈরি করেননি, বরং এটি শায়খ মুহাম্মদ ইসহাক দেহলভী রাহ.-এর সামনে পঠিত আবু দাউদের কপিতে (নুসখা) রয়েছে, যা শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. আবু দাউদের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘বযলুল মাজহুদে’র টীকায় উল্লেখ করেছেন।
আর উক্ত কপিটি আবু দাউদের বিভিন্ন কপির সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছে এবং ধারণা করে হচ্ছে, শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে সালেম বসরী মক্কী রাহ. (মৃ. ১১৩৪ হি.) এর কপির সাথেও মিলানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত:
হাদীসের ইমামগণের গ্রন্থসমূহ থেকে এমন অনেক প্রমাণ দেখানো যাবে, যাতে সুস্পষ্ট আবু দাউদের উদ্ধৃতিতে ‘বিশ রাকাআত’ শব্দই উল্লেখ হয়েছে।
প্রথম প্রমাণ:
হাদীস জগতের সম্রাট ইমাম যাহাবী রাহ. (মৃ. ৭৪৮ হি.) রিজাল শাস্ত্রের সুপরিচিত কিতাব ‘সিয়ার“ আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে লেখেন,
وفي "سنن أبي داود" يونس بن عبيد، عن الحسن: أن عمر بن الخطاب جمع الناس على أبي بن كعب في قيام رمضان فكان يصلي بهم عشرين ركعة.
অর্থাৎ ‘সুনানে আবু দাউদ’ গ্রন্থে রয়েছে, উবাই ইবনে কা’ব রা. রমযানে লোকদের নিয়ে ‘বিশ রাকাআত’ তারাবীহ পড়তেন।
দ্বিতীয় প্রমাণ:
প্রখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে কাসীর রাহ. (মৃ. ৭৭৪ হি.) ‘জামিয়ুল মাসানীদ’ গ্রন্থে বলেন,
أن عمر جمع الناس على أُبي، فكان يصلي بهم عشرين ركعة. الحديث ورواه أبو داود عن شجاع بن مخلد عن هُشيم عن يونس بن عبيدٍ عن الحسن عن أبي.
অর্থাৎ ‘বিশ রাকাআত’ শব্দ দ্বারা বর্ণনাটি উল্লেখের পর বলেন, ইমাম আবু দাউদ রাহ. এটি বর্ণনা করেছেন। অতপর আবু দাউদ থেকে পূর্ণ সূত্র উল্লেখ করেন।
তৃতীয় প্রমাণ:
ইমাম আহমদ ইবনে র্ফহ ইশবীলী রাহ. (মৃ. ৬৯৯ হি.) ‘মুখতাসার“ খিলাফিয়াতিল বায়হাকী’ কিতাবে আবু দাউদের উদ্ধৃতিতে ‘বিশ রাকাআত’ শব্দই উল্লেখ করেছেন।
চতুর্থ প্রমাণ:
প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হায়াতুল হায়ওয়ানে’র লেখক আল্লামা মুহাম্মদ বিন মুসা দামীরী রাহ. (মৃ. ৮০৮ হি.) ‘আন-নাজমুল ওয়াহহাজ’ গ্রন্থে আবু দাউদ থেকে ‘বিশ রাকাআত’ শব্দেই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।
এ সকল দলীল থেকে নিশ্চিতভাবে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আবু দাউদের কোনো কোনো কপিতে ‘বিশ রাকাআত’ শব্দ রয়েছে, যা বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। কেননা তা ইমাম যাহাবী ও ইবনে কাসীর রাহ.-এর মত ব্যক্তিবর্গের কাছে ছিল।
আর এমন নির্ভরযোগ্য কপি শায়খুল হিন্দ রাহ.-এর কাছেও থাকায় তিনি ‘বিশ রাকাআত’ শব্দ উল্লেখ করেছেন। যেমনটি ইমাম যাহাবী রাহ.সহ অন্যরা করেছেন। কাজেই এখানে দোষের কিছু নেই।
অন্যথায় শায়খুল হিন্দ রাহ.-এর নামে ‘নিজের পক্ষে থেকে শব্দ পরিবর্তন বা তৈরি করা’র যে অপবাদ দিয়েছেন, একই অপবাদ ইমাম যাহাবী রাহ.সহ অন্যদের সম্পর্কে দিয়ে দুঃসাহস দেখিয়ে দেন! পছন্দ আপনা আপনা।
দুই:
তাওহীদ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত আহলে হাদীস বন্ধুদের অনূদিত বুখারী শরীফের প্রথম খণ্ডের শুর“তে একটি শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘এত অনূদিত বুখারী থাকতে পুণরায় এর প্রয়োজন হল কেন?’
তাতে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে যাঁরা এ সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থের অনুবাদ করেছেন, তাঁদের অনেকেই আবার হাদীসের অনুবাদে সহীহ হাদীসের বিপরীতে মাযহাবী মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অনুবাদে গরমিল ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। নমুনা স্বরূপ মূল বুখারীতে ইমাম বুখারী কিতাবুস সওমের পরে কিতাবুত তারাবীহ নামে একটি পর্ব রচনা করেছেন। অথচ ভারতীয় মুদ্রণের মধ্যে দেওবন্দী আলেমদের চাপে(?) কিতাবুত তারাবীহ কথাটি মুছে দিয়ে সেখানে কিয়ামুল লায়ল বসানো হয়েছে। অবশ্য প্রকাশক পৃষ্ঠার একপাশে কিতাবুত তারাবীহ লিখে রেখেছেন।
এভাবে মুযাফফর বিন মুহসিন তার তারাবীহর বইয়ে বলেছেন, ইমাম বুখারী রাহ. কিতাবু সালাতিত তারাবীহ নামে একটি শিরোনাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ছাপা থেকে উক্ত শিরোনাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা এক প্রকার তথ্য সন্ত্রাস।
প্রকৃত রহস্য:
প্রথমত: ইমাম বুখারী রাহ. থেকে বুখারী শরীফ কিতাবটি সরাসরী অনেকে শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে চার জন সুপরিচিত।
১. মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ ফিরাবরী (২৩১-৩২০ হি.)।
২. ইবরাহিম ইবনে মা’কিল নাসাফী (মৃ. ২৯৫ হি.)।
৩. হাম্মাদ ইবনে শাকের নাসাভী (মৃ. ৩১১ হি.)।
৪. আবু তলহা মনসুর বযদভী (মৃ. ৩২৯ হি.)।
তবে ফিরাবরীর বর্ণনা সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। আর ফিরাবরী থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর নয় জন শিষ্য। তন্মধ্যে একজন হলেন হাফেজ ইবরাহিম ইবনে আহমদ মুসতামলী (মৃ. ৩৭৬ হি.)।
এবার মূল কথায় আসি। তা হচ্ছে, ফিরাবরীর যে নয় জন শিষ্য রয়েছে, তন্মধ্যে শুধু মুসতামলী একা ‘কিতাবু সালাতিত তারাবীহ’ শিরোনামটি বর্ণনা করেছেন; বাকী আট জনের কেউ বর্ণনা করেননি।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (মৃ. ৮৫২ হি.) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে লেখেন,
كذا في رواية المستملي وحده، وسقط هو والبسملة من رواية غيره.
উক্ত শিরোনাম শুধু মুসতামলীর বর্ণনায় রয়েছে। অন্যদের বর্ণনা থেকে তা বাদ পড়েছে।
এভাবে আল্লামা বদর“দ্দীন আইনী রাহ. (মৃ. ৮৫৫ হি.) ‘উমদাতুল কারী’ গ্রন্থে বলেন,
كذا وقع هذا في رواية المستملي وحده، وفي رواية غيره لم يوجد هذا.
উক্ত শিরোনাম শুধু মুসতামলীর বর্ণনায় পাওয়া যায়। অন্য কারো বর্ণনায় তা পাওয়া যায় না।
সুতরাং নয় জনের মধ্যে আট জনের বর্ণনায় না থাকলে যদি দোষণীয় না হয়, তাহলে কোন ছাপায় না থাকলে তথ্য সন্ত্রাস বা দোষণীয় হবে কেন?
দ্বিতীয়ত:
উক্ত শিরোনাম একেবারে বাদ দেওয়া হয়নি, বরং পৃষ্ঠার একপাশে রাখা হয়েছে। (এটি আবার প্রকাশক করেননি, বরং কিতাবটির টীকা ইত্যাদি লেখে যিনি কপি তৈরি করেছেন অর্থাৎ আহমদ আলী সাহারনপুরী রাহ. তিনি করেছেন।) আর আমানতদারী ও যুক্তিরও দাবী হচ্ছে মূল কিতাবে না রেখে পৃষ্ঠার একপাশে রাখা। কেননা নয় জনের মধ্যে আট জন তথা অধিকাংশের বর্ণনাতেই যেহেতু নেই, সেহেতু বাস্তবে না থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। তাই মূল কিতাবে তা রাখা হয়নি। তবে এক জনের বর্ণনায় যেহেতু তা রয়েছে, তাই বাস্তবে থাকার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কাজেই পৃষ্ঠার একপাশে রাখা হয়েছে। এর চেয়ে বড় আমানতদারী আর কী হতে পারে। অথচ এটাকে বলা হচ্ছে জালিয়াতি! আরো বলা হচ্ছে, ‘দেওবন্দী আলেমদের চাপে শিরোনামটি মুছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রকাশক পৃষ্ঠার একপাশে তা লিখে রেখেছেন’। সুবহানাকা হাযা বুহতানুন আযীম!
তৃতীয়ত:
মিসরের শায়খ আহমদ মুহাম্মদ শাকের সহ অনেক মুহাক্কিক আলেমের মতে বর্তমান ইসলামি বিশ্বে বুখারী শরীফের সর্বাধিক বিশুদ্ধ কপি হচ্ছে, ‘আন-নুসখাতুল ইউনীনিয়্যাহ’, যা মুহাদ্দিস শরফুদ্দীন আবুল হুসাইন আলী ইউনীনী হাম্বলী রাহ. (৬২১-৭০১ হি.) অনেক কষ্ট করে তৈরি করেছিলেন। এর পর যুগে যুগে আলেমগণ উক্ত কপি থেকে অনেক কপি তৈরি করেন।
এমন কপিসমূহের মধ্যে থেকে নির্ভরযোগ্য কপি ও বুখারী শরীফের অন্যান্য কপির আলোকে নতুন একটি কপি তৈরি করা হয়, যা সুলতান আব্দুল হামিদ রাহ.-এর নির্দেশে মিসর কায়রোর ‘আল-মাতবাআতুল আমীরিয়্যাহ’ থেকে ১৩১১ হিজরী সনে শুর“ হয়ে ১৩১৩ হিজরীতে সম্পূর্ণ কিতাব ৯ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। আর উক্ত কপিকে বলা হয় ‘আত-তবআতুস সুলতানিয়্যাহ’।
পরবর্তীতে ১৪২২ হিজরী সনে ‘আল-মাতবাআতুল আমীরিয়্যাহ’র মুদ্রিত কপি থেকে কপি করে বৈর“তের ‘দার“ ত্বওকিন নাজাত’ লাইব্রেরি যুহাইর বিন নাসেরের সম্পাদনায় পূর্ণ বুখারী শরীফ ৯ খণ্ডে প্রকাশ করে, যা আমাদের কাছে রয়েছে। তাতেও তৃতীয় খণ্ডের ৪৪ নং পৃষ্ঠায় দেখা যায়, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ছাপার মত উক্ত শিরোনাম পৃষ্ঠার একপাশে রাখা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সর্বাধিক বিশুদ্ধ কপি ‘আন-নুসখাতুল ইউনীনিয়্যাহ’তেও উক্ত শিরোনাম পৃষ্ঠার একপাশে রয়েছে।
এখন বলুন, ভারতীয় মুদ্রণে না হয় দেওবন্দী আলেমদের চাপে এমন করা হয়েছে! কিন্তু সর্বাধিক বিশুদ্ধ কপিতে এবং তা থেকে কপিকৃত কপিতে কাদের চাপে উক্ত শিরোনাম পৃষ্ঠার একপাশে রাখা হয়েছে?
সুতরাং দেওবন্দীরা কোন খেয়ানত বা বিকৃতি করেনি, বরং পূর্ণ আমানতদারী রক্ষা করেছে।
প্রিয় পাঠক! বিভিন্ন বিষয়ে এমন অপবাদ তাদের বইসমূহে আরো পাবেন। কিন্তু বিচলিত হবেন না; আস্থা হারাবেন না। সবেরই প্রকৃত রহস্য ও সঠিক তথ্য রয়েছে, যা একটু কষ্ট করে জেনে নিতে হবে। সর্বদা মনে-প্রাণে এ কথার পূর্ণ বিশ্বাস রাখবেন, দেওবন্দীগণ কোন ভ্রান্ত দল নয় যে, তাদেরকে কোন খেয়ানত বা জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হবে।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য ও সঠিক বিষয় জানার, বুঝার ও প্রচারের তাওফীক ইনায়েত কর“ন। এবং অন্যকে বিভ্রান্ত করা থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান কর“ন। আমীন!
দেখুন, “বিকৃতি ও বিভ্রান্তির কবলে তারাবীহর নামায”
সাঈদ আহমদ, হাটহাজারী মাদরাসা
মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবের অভিযোগ ও প্রকৃত রহস্য


কোন মন্তব্য নেই