জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম।
জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম।
(শেষতক না পড়ে প্রতিক্রিয়া না জানানোর অনুরোধ।)
আঞ্চলিক/ভৌগলিক, গোত্রীয় বা অন্য কোন ধরণের জাতীয়তা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং অনুমোদিত।
রাসূল সা. সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী মুসলমানদের শাসনামলেও বিভিন্ন অঞ্চলের/ভূখণ্ডের অধিবাসী মুসলিমদেরকে তাদের অঞ্চলের সাথে সম্পৃক্ত করেই উল্লেখ করা হতো। যেমন, সিরিয়া অঞ্চলের মুসলমানদেরকে আহলে শাম' বলা হতো। ইয়েমেনের অধিবাসীদের ইয়ামানী বলা হতো। রোমান সাম্রাজ্যে বসবাসকারীদের 'রুমী' বলা হতো। বিভিন্ন গোত্রের মুসলমানদেরকে তাদের গোত্রীয় পরিচয়েই আহ্বান করা হতো, দলবদ্ধ করে দায়িত্ব অর্পন করা হতো। রাসূল নিজে এবং সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের গোত্রীয় ও ভৌগলিক পরিচয়কে সবসময়ই উল্লেখ করতেন। বিষয়টা এতোটাই প্রসিদ্ধ ও স্পষ্ট যে এর উদাহরণ চাওয়াও বাতুলতা। এরপরেও পরিস্থিতির বিবেচনায় কয়েকটা সহজ উদাহরণ দিচ্ছি।
এক, রাসূল নিজের ও মুহাজির সাহাবীদের মক্কী পরিচয় বহাল রেখেছিলেন। গোত্রীয় দৃষ্টিকোনে নিজেদেরকে তারা কুরাঈশ বলে পরিচয় দিতেন।
দুই, মদিনার সাহাবারা নিজেদেরকে আউস অথবা খাযরাজ গোত্রের পরিচয় উল্লেখ করতেন।
তিন, কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়েও মুসলমানরা স্বীয় দলের/গোত্রের/অঞ্চলের লোকজনের সাথে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থিত হতেন। এমনকি একেক গোত্রের একেক রকম পতাকা থাকতো। অনেকসময় রাসূল একেক গোত্রকে যুদ্ধের ময়দানের একেক পাশে মোতায়েন করতেন। পরবর্তীতে শত শত বছর মুসলমানের মাঝে এই পদ্ধতি বহাল ছিলো।
ইসলাম মানুষের ভৌগলিক/গোত্রীয় পরিচয়কে কখনোই মুছতে চেষ্টা করেনি। বরং বিষয়টাকে অবলীলায় গ্রহণ করেছে।
তবে ইসলাম মানুষের জাতীয়তা সংক্রান্ত চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংযোজন বিয়োজন করেছে।
ইসলাম এসে আমাদেরকে শিখিয়েছে 'আমার জাতীয়াতা যাই হোক না কেন ধর্মীয় পরিচয় ও বন্ধন সকল কিছুর উর্দ্ধে।' তাই কখনো আমাদের গোত্রীয় বা ভূখণ্ড কেন্দ্রিক জাতীয় স্বার্থের সাথে ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থের বিরোধ হলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ইসলামকে প্রাধান্য দিবো। ইসলাম অনুসারে, আমরা আমাদের ভূখণ্ডের অধিবাসী অমুসলিমদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও আন্তরিক থাকবো কিন্ত অন্য ভূখণ্ডের অধিবাসী মুসলিমদেরকে আমরা আমাদের আত্নীয় কোন অমুসলিমের চেয়েও বেশি আপন ভাববো। এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক সকল কিছুর উর্দ্ধে গিয়ে আমাদের হৃদয়ে ও বিশ্বাসে স্থান পাবে।
একজন মুসলমান পূর্ণ আন্তরিকতার সাথেই তার জাতীয়তাকে ধারন করবে। যেভাবে রাসূল ও সাহাবারা করেছেন। দেড় হাজার বছর ধরে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানরা করেছেন। কিন্ত কখনোই সে জাতীয়তার জন্য ইসলাম ও মুসলমানের সাথে কম্প্রোমাইজ করবেনা। বরং তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রক্ষার্থে এই পার্থিব জাতীয়তার সাথে সে কম্প্রোমাইজ করতে প্রস্তত থাকবে। অথবা নিজস্ব বলয়ে জাতীয়তার ভুল চেতনা প্রচলিত থাকলে এর মৌলিক কাঠামোতেই পরিবর্তন এনে একে ইসলামের অনুগামী করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের ছড়িয়ে থেকেও, শত ধরণের জাতীয় পরিচয়ে পরিচিত হয়েও মুসলমানরা হবে এক দেহ এক প্রাণ।
মুসনাদে আহমাদের এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন যে, 'যে ব্যক্তি মানুষকে আসাবিয়াহ এর দিকে আহ্বান করলো সে যেন নিজের পিতার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরলো।' (মুসনাদে আহমাদ-২১২৩৬)
অনেকে এই হাদিসের অনুবাদে আসাবিয়াহ শব্দের সরল অনুবাদ হিসেবে 'জাতীয়তাবাদ' শব্দটা ব্যবহার করেন। এবং বিপুল পরিমাণ সরল মুসলমান মনে করেন যে, নিজেদের ভৌগলিক বা গোত্রীয় জাতীয়তার উল্লেখ করাটা এই আসাবিয়াহ এর অন্তর্ভুক্ত। অথচ বিষয়টা কখনোই এমন নয়। বরং এটা হাদিসের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা।
এই হাদিসে আসাবিয়াহ এর অর্থ হচ্ছে 'অন্যায় সাম্প্রদায়িকতা।' অর্থাৎ কেউ যদি ইসলাম বা মুসলমানের স্বার্থের বিপরীতে কোন অন্যায়ের পক্ষে জাতীয়তার দোহাই দিয়ে তার স্বজাতিকে সমর্থন জানানোর আহ্বান করে কিংবা তাদের এই ভূখণ্ড কেন্দ্রিক বা গোত্রীয় জাতীয়তার স্বার্থকে ইসলামের উপরে প্রাধান্য দিতে উদ্বুদ্ধ করে তাহলে সে এই হাদিসের লক্ষ্যবস্তু হবে। জঘন্য অপরাধী সাব্যস্ত হবে। এ ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা শতভাগ পরিত্যাজ্য। আমাদের ধর্মীয় রুচি ও বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক।
আমরা ঐতিহ্যগতভাবে হাজার বছর ধরেই ইসলামের বাইরে এ ধরণের সকল উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। কিন্ত মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত জাতীয়তার সাথে, নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সাথে আমাদের ও আমাদের ধর্মবিশ্বাসের কোন বিরোধ নেই। ইসলাম এ জাতীয় সংকীর্ণতার উর্দ্ধে।
আমরা প্রথমত মুসলিম। এরপর বাঙালী। এই আত্নপরিচয়ে আমাদের কোন সংশয় বা দ্বিধা নেই।
সংযুক্তি:
এদেশের নাস্তিক বুদ্ধিজীবীরা কেউ কেউ আজকাল যে ধরনের উগ্র, অতিরঞ্জিত জাতীয়তাবাদ শেখান ও চর্চা করেন এর সাথে ইসলাম ও মুসলমানের কোন সম্পর্ক নেই। তারা ইসলামকে সবার নিচে রেখে জাতীয়তার নতুন সংজ্ঞা ও চেতনাকে প্রাধান্য দিতে বলেন। জাতীয়তার ভিত্তিতে গঠিত নিজস্ব বলয়ের স্বার্থের জন্য মানবতা, নৈতিকতা ও সকল ধর্মের বিপরীতে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন।
এবং এই বলয়ের আইন ও নৈতিকতার রুপরেখা নির্ধারনের জন্য কিছু কল্পিত, অপূর্ণাঙ্গ ও একপেশে ভোগবাদী রুচির আশ্রয় নেন। যেখানে হাজার হাজার বছরের লালিত, অভিজ্ঞতালব্ধ নীতিবোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল ও পরিক্ষিত ধর্মীয় অনুশাসনকে উপেক্ষা করা হয়। যেখানে স্বার্থের কাছে মানবতাও নিতান্ত গৌন।
এ ধরণের চেতনা কুফর। কোন মুসলমান এর সাথে একমত হতে পারেনা।

কোন মন্তব্য নেই