হিফজী মিনাল কুরআন
হিফজী মিনাল কুরআন-৫
পুরো কুরআন সূরা ফাতিহার মতো হিফজ করার অব্যর্থ কৌশল
১ঃ পনের লাইনে পৃষ্ঠা এমন হাফেজী কুরআন নিবো। ভাল হয়, ত্রিশ পারা আলাদা আলাদা করে ভাগ করে বাঁধাই করা হলে। বাজারে এমন পাওয়া যায়।
২. একপৃষ্ঠা নির্ধারণ করব। বেশি না হওয়াই ভাল। আগে মুখস্থ থাকলেও কোনও পৃষ্ঠাই এই নিয়মের বাইরে থাকবে না।
নাজেরা
৩. পুরো পৃষ্ঠ কমপক্ষে বিশবার দেখে দেখে পড়ব। প্রতিটি শব্দের যবর-যের-পেশ খেয়াল করে করে পড়ব। কোনও শব্দ উচ্চারন করতে কঠিন লাগবে, শব্দটা বারবার পড়বো। সম্ভব হলে একজনকে পৃষ্ঠাটার নাজেরা শুনিয়ে নেব। কেউ না থাকলে, শায়খ হুসারীর তিলাওয়াত থেকে শুনব। আমাকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, নাজেরা মানে দেখে দেখে পড়াটা নির্ভুল হয়েছে। কারণ নাজেরা ভুল হলে, হেফজ ভুল হবে। একবার ভুল মুখস্থ হয়ে গেলে, শুদ্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
.
হিফজ
৪. প্রথম সতর (লাইন) কমপক্ষে দশবার পড়ব। আয়াত ছোট হলে, পুরো আয়াত একবারে দশবার পড়ব। ভাল করে মুখস্থ হলে, দ্বিতীয় সতর বা আয়াত কমপক্ষে দশবার পড়ব। এবার উভয় সতর বা আয়াত মিলিয়ে কমপক্ষে দশবার পড়ব। এভাবে প্রতিটি সতর বা আয়াত কমপক্ষে দশবার করে পড়ব। তারপর আগের সতর বা আয়াতের সাথে মিলিয়ে কমপক্ষে দশবার পড়ব। গোটা পৃষ্ঠা মুখস্থ হলে, পুরো পৃষ্ঠা না দেখে কমপক্ষে দশবার পড়ব। কোনও শব্দে সন্দেহ বা খটকা লাগবে, মুসহাফ (কুরআন) দেখে জায়গাটি কয়েকবার পড়ে নেব। তারপর পরিবারের কাউকে বা বন্ধুকে বা ওস্তাদকে পৃষ্ঠাটি একবার শোনাব। শোনাতে গিয়ে কোথাও আটকালে বা ধাক্কা খেলে, আবার পুরো পৃষ্ঠার খটকা লাগা জায়গাগুলো ভাল করে পরে, আবার শোনাব। সন্দেহ-খটকামুক্ত হয়ে নিখুঁত মসৃণ সাবলিলভাবে শোনাতে পারা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবো। এরপর উঠতে বসতে, শুতে-খেতে, হাঁটতে-চলতে, ঘুমুতে-জাগতে যখনই সুযোগ হবে, পৃষ্ঠাখানা পড়তে থাকব।
৫. পরদিন দ্বিতীয় পৃষ্ঠা আগের নিয়মে শুরু করব। আজকের প্রথম আয়াত, আগের দিনের শেষ আয়াতের সাথে মিলিয়ে দশবার পড়তে ভুলব না। নিয়মসম্মতভাবে পুরো পৃষ্ঠা ইয়াদ হলে, আগের দিনের পৃষ্ঠার সাথে আজকের পৃষ্ঠা মিলিয়ে কমপক্ষে দশবার মুখস্থ পড়ব। সম্ভব হলে মুসহাফ থেকে দূরে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পড়ব। পুরোপুরি নিশ্চিত ইয়াদ হওয়ার পর, শোনাতে বসব।
৬. আগের পৃষ্ঠা ইয়াদের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া ছাড়া পরের পৃষ্ঠায় যাবো না। আস্তে আস্তে পৃষ্ঠা বাড়তে থাকলে, প্রতিদিন পেছন থেকে কমপক্ষে পাঁচ পৃষ্ঠা, সম্ভব হলে আরও বেশি মুখস্থ পড়ব। একপারা ইয়াদ হলে, প্রতিদিনের পৃষ্ঠা ইয়াদ শেষ করে, পুরো পারাটা একবার করে মুখস্থ পড়ে যাবো। এভাবে তিনপারা ইয়াদ হওয়া পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ, দুই পারা ইয়াদ হলে, আজকের সবক ইয়াদের পর প্রতিদিন পেছনের পুরো দুই পারা বা তিন পারা পড়ব।
৭. চার পারা ইয়াদ হলে, প্রতিদিন পেছন থেকে তিনপারা করে মুখস্থ তিলাওয়াত করব। প্রথম দিন পড়ব প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পারা। দ্বিতীয় দিন পড়ব চতুর্থ, প্রথম ও দ্বিতীয় পারা। তারপর দিন তৃতীয়, চতুর্থ ও প্রথম পারা। পেছনের পড়াগুলো অন্যকে শোনাতেও ভুলব না।
৮. ছয় পারা ইয়াদ হলে, প্রতিদিন তিন পারা করে মুখস্থ তিলাওয়াত করব। এভাবে শেষ পর্যন্ত চলতে থাকবে। আমার যদি পনের পারা ইয়াদ হয়, প্রতিদিন পেছন থেকে তিন পারা করে মুখস্থ তিলাওয়াত করলে, পাঁচ দিনে একবার পেছনের পড়া তিলাওয়াত হয়ে যাবে। পেছনের পারাগুলো কাউতে শোনাতে ভুলব না।
৯. পেছনের পড়া পড়তে গিয়ে বা শোনাতে গিয়ে, কোথাও নতুন করে খটকা লাগলে, জায়গাটা বারবার পড়ে, খটকা দূর করে নেব। পুরো পৃষ্ঠাখানা বারকয়েক মুখস্থ পড়ে নেব। একটা খাতা বানিয়ে, সেখানে সন্দেহ ও খটকা লাগা স্থানগুলো চিহ্নিত করে রাখব। তিলাওয়াতের সময় এই স্থানগুলোর দিকে বাড়তি নজর রাখব।
.
সতর্কীকরণঃ
১. প্রতিদিন নতুন সবক ইয়াদের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবো। তারপর পেছনের পড়া তাকরার করব। হিফজযাত্রায় পেছনের পড়া বারবার পড়ার কোনও বিকল্প নেই।
২. একজন হিফজসঙ্গী বানিয়ে নিতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়। সপ্তাহে একটি দিন ছুটি কাটাব। সেটা হতে পারে জুমাবার। এদিন নতুন সবক মুখস্থ করব না।
৩. প্রতি সপ্তাহ বা দশদিন অন্তর অন্তর অভিজ্ঞ কারো কাছে পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা রাখব। অভিজ্ঞ হাফেজ সাহেবের কাছে পরীক্ষা দেয়ার উপকারিতা হল, তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থেকে প্রশ্ন করবেন। যেসব জায়গায় সাধারণত হাফেজগন সমস্যার সম্মুখীন হন, সেগুলোই তিনি প্রশ্ন করবেন। এতে ফল হবে, প্রশ্নের জায়গাগুলো ভাল করে জানা হয়ে যাবে। কঠিন জায়গাগুলোতে বাড়তি নজর পড়বে। এতে করে জায়গাগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ইয়াদ হবে।
.
গুরুত্বপূর্ণ নসীহা
১ঃ কুরআন কারীম হিফজ করতে পারা, আল্লাহর বিরাট নেয়ামত। অত্যন্ত মযাদাসম্পন্ন নেয়ামত। কুরআন কারীম হিফজ করা এক মহা ইবাদত। আমি হাফেজ হতে পারলে, আমার সীনা হবে, কুরআন কারীমের ‘আধার’। আমি হব আল্লাহর কালামের ধারক ও বাহক। আমি হাফেজ হওয়ার মানে, আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বটেই, পাশাপাশি সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের ওহী, নিজের মধ্যে ধারণ করলাম। আমি হাফেজ হওয়ার মানে, আমি নবী না হওয়া সত্ত্বেও, আমার প্রতি ওহী নাযিল না হওয়া সত্বেও, নিজের মধ্যে নবুওয়াতের পুরো ইলম ধারণ করলাম।
২. এমন বিরল সৌভাগ্য অর্জনের ইচ্ছা কার না হয়? কুরআন কারীম হিফজ করার পেছনে, আমার সবটুকু মেধা-যোগ্যতা ব্যয় করতেও পিছপা হবো না। কুণ্ঠিত হবো না। আমার সময়ের সর্বোচ্চটুকু কুরআন হিফজে দিতে দ্বিধান্বিত হবো না। ইন শা আল্লাহ আল্লাহ আমার সময়ে বরকত দান করবেন। আমার শরীর-স্বাস্থ্যে বরকত দান করবেন। আমার শক্তি-সামর্থ্যে বরকত দান করবেন। আমি যেখানেই থাকি, যাই করি, আমার সবকিছুকে বরকতময় করে তুলবেন। আবার বাড়িঘরকে বরকতময় করে দিবেন।
৩. আমি মনে রাখব, কুরআন কারীম হিফজ করা, নেককার-সালেহীনের কাজ। কুরআন হিফজ করা, উম্মাহর বড় বড় ব্যক্তিদের কাজ। দুনিয়ার যত ইলম-জ্ঞানই শিখি, কুরআন কারীম হিফজ করবই। কুরআন হিফজের ব্যাপারে অন্য কিছুর সাথে আপস করব না। ইন শা আল্লাহ।
৪. উপরোক্ত পদ্ধতিতে মুখস্থ করার বিরুদ্ধে নফস ও শয়তান বারবার বিদ্রোহ করে উঠবে। নানা দিক থেকে আলস্য জেঁকে ধরবে। দুনিয়ার কোনও পড়াই এভাবে মুখস্থ করা হয় না। নাফস বারবার বিভিন্ন তুলনা সামনে আনবে। নানাভাবে নিরস্ত করতে চাইবে। এসব বাধা টপকাতে হবে, সবর, সলাত, ইস্তেগফার ও দোয়ার মাধ্যমে। নফস-শয়তানের এসব ওয়াসওয়াসা, কুমন্ত্রণা ডিঙ্গাতে পারলে, আমি একসময় হাফেজগনের ঈর্ষণীয় কাতারে শামিল হতে পারব।
৫. একটু হিম্মত করে আগে বাড়তে হবে। হিফজের পথ আপাত কঠিন মনে হলেও, আল্লাহর অফুরন্ত রহমত আর আমার প্রবল ইচ্ছাশক্তির চেয়ে নিশ্চয়ই বেশি কঠিন নয়। প্রথম দিকে জোর করে নিজেকে হিফজের মেহনতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। একবার অভ্যেস হয়ে গেলে, পড়ার চাকা ঘুরতে থাকবে, ইন শা আল্লাহ। কুরআন কারীমকে আল্লাহ তাআলা সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহর এই আশ্বাসবাণী সবসময় মাথায় রাখব,
وَلَقَدۡ یَسَّرۡنَا ٱلۡقُرۡءَانَ لِلذِّكۡرِ فَهَلۡ مِن مُّدَّكِرࣲ
আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। আছে কি কোনও উপদেশ গ্রহণকারী? (সূরা কামার ১৭)।
৬. এই আয়াত আমার জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা। এই আয়াত আমার জন্য, শয়তানের সমস্ত কুরআনবিরোধী প্ররোচনা আর কুমন্ত্রণার জবাব। আমার হিফজযাত্রায় এই আয়াত আশার মশাল। যে কোনও বড় কাজে বাধা আসেই। যে কোনও ভাল কাজের শত্রু থাকেই। আমার হিফজযাত্রায় শয়তানই সবচেয়ে বড় বাধা। বড় শত্রু। কাজের বাধা ও শত্রু চিনতে পারা, অনেক বড় সাফল্য। আমি যেহেতু শত্রু ও বাধা চিনে গেছি, আমার করণীয় অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে।
৭. শয়তান ভাল করেই জানে, কুরআন এই উম্মাহর প্রধানতম শক্তি। কুরআন এই উম্মাহর প্রধানতম প্রেরণা। কুরআন এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম সম্মান। কুরআন দ্বারাই এই উম্মাহ নেতৃত্বের আসনে আসীন ছিল ও আসীন হবে। কুরআনের মাধ্যমেই উম্মাহর ঈমান-মনোবল বৃদ্ধি পাবে। কুরআনের মাধ্যমেই এই উম্মাহ হালাল-হারাম চিনতে পারে। কুরআন এই উম্মাহর সুরক্ষার গ্যারান্টি। কুরআনের মাধ্যমেই এই উম্মাহ জান্নাতের উচ্চতম স্তরে উন্নীত হবে। কুরআনের ধারককে কেয়ামতের দিন বলা হবে,
يُقالُ لصاحبِ القرآنِ اقرأْ وارتقِ ورتِّلْ كما كنت تُرتِّلُ في الدنيا فإنَّ منزلَك عند آخرِ آيةٍ تقرؤُها
কেয়ামতের দিন কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক। দুনিয়াতে যেভাবে ধীরেসুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেভাবে ধীরেসুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই হবে তোমার স্থান (আবদুল্লাহ বিন আমর রা.। আবূ দাউদ ১৪৬৪)।
.

কোন মন্তব্য নেই