আমি সত্যি কেঁদেছি এই চিঠি পড়ে
আমি সত্যি কেঁদেছি এই চিঠি পড়ে
প্রিয়তম ইয়া রাসূলুল্লাহ !
বাক্যহীন বর্ষণ আর ভাঙা হৃদয় নিয়ে আমি আপনাকে লিখছি। আপনার প্রতি যথার্থ সম্মান নিবেদন করতে না পারার হৃদয় বেদনায় ভুগছি।
রাসূলুল্লাহ!
আপনাকে চিঠি লেখা আমার আজন্ম শখ!
হৃদয়ে জমে থাকা ভালোবাসা আর চোখ ভর্তি পানি নিয়ে আমি রোজ আপনাকে লিখতে বসি। অন্যরকম এক শিহরণ! একটা শব্দতেই থেমে থাকি।
আপনাকে লেখার সাধ্য যে আমার নেই। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কান্নারা। ছোটবেলায় যখন আপনার গল্প শুনতাম; তখন ভাবতাম আপনি বুঝি বেঁচে আছেন। খুব উৎসুক হয়ে বলতাম "জানো আরবে আমার একজন বন্ধু আছেন! আমি যখন বড় হবো তখন তাঁর সাথে দেখা করতে যাবো। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসবেন।"
সবাই বেশ আগ্রহভরে আমার কথাগুলো শুনতো। তারপর কোনো একদিন শুনলাম আপনি নেই। আমার হৃদয়ে সেদিন ঝড় উঠেছিলো, চোখ দিয়ে নেমেছিলো অমোঘ বর্ষণ। আমার ব্যাকুল হৃদয়খানা সেদিন কাতরাচ্ছিলো। আমি আকাশের তারাদের মাঝে আঙুল দিয়ে আপনাকে খুঁজে ছিলাম।
মুহাম্মদ! এই নামটা আমার বড্ড প্রিয়। সবসময় আপনার পবিত্র এই নামটা আওড়ানো আমার অভ্যাস। এক অন্যরকম প্রশান্তি। তারপর একদিন আপনি আমার স্বপ্নে এলেন! সেদিনের অনুভূতি আমি কখনোই ব্যক্ত করতে পারবো না। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিলো স্বপ্নে আপনাকে দেখা। অশ্রুরা আর মানছে না প্রিয়তম হাবিব। আপনাকে নিয়ে কেবল আমার অনুভূতি গুলো লিখেও শেষ করা যাবে না। শরীরে কাঁপুনি শুরু হবে।
প্রিয়তম আহমদ!
আপনার এতো ত্যাগের জন্যই আজ আমরা এতো সুন্দর ভাবে চলাফেরা করছি। ধীরে ধীরে অন্ধকার সরিয়ে আলোকিত করার প্রদীপ আপনি। এই প্রদীপে লেগে থাকা জান্নাতি সুবাস পৃথীবিকে ঘ্রাণে ভরিয়ে দিয়েছে। এই সুবাস আমাকে জান্নাতের আঙিনায় বিচরণ করায়।
ইয়া রাসূলুল্লাহ!
ছোটবেলায় পরিচয় ঘটে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ নামটার সাথে। আমি বেশ তৃপ্তি সহকারে ঘটনা গুলো পড়ে যেতাম। কখনো কখনো কান্নায় বুক বাসাতাম। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমার আপনার কথা মনে পড়তো। চোখের কার্ণিশ বেয়ে পানির জোয়ার বইতো। আপনার প্রতি অত্যাচারীদের অত্যাচার আমাকে ভাবায়। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চোখ বন্ধ করলেই আমি অনুভব করি আপনার ত্যাগ! কখনো কখনো হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠি।
চোখ বন্ধ করলেই আমার হৃদয়ের কর্ণে ভেসে উঠে বিদায় হজ্বের ভাষণ। আমার কল্পনায় খুঁজে বেড়াই আপনাকে। হৃদয়ের মঞ্জিলে গেঁথে থাকা মুহাম্মদ নামটা আমার অধিক প্রিয়। আপনার এই অসাধারণ নামে আমি খুঁজে পাই জান্নাত! যেখানে আমার চোখজোড়া প্রিয়তম হাবিবকে খুঁজতে থাকে, আমার হৃদয়টা ধুকপুক আওয়াজ করতে থাকে। রাসূলকে একবার দেখার জন্য আমার অন্তরের তৃষ্ণা অনুর্বরতায় ছেঁয়ে যায়।
প্রিয়তম হাবিব!
আজ আপনাকে লিখতে বসে আমি বারবার অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। আপনাকে কি লিখবো ভেবেই পাচ্ছি না। হাবিব! আপনাকে যখন জান্নাতে দেখবো; তখন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না। কাঁদতে কাঁদতে হয়তো সেখানেই লুটিয়ে পড়বো। আপনাকে ভালোবাসি আমার রাসূল।
আমার রাসূলুল্লাহ!
তায়েফের ঘটনা আমার অন্তরকে দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দেয়। চেহারায় প্রস্ফুটিত করে বিষন্নতা। নয়নযুগল নীরে ভরে যায়। চিৎকার করে বলে উঠতে ইচ্ছে করে,
"ঐ তায়েফবাসী! তোমরা আমার রাসূলুল্লাহকে চিনলে না।
তোমরা শুধু তাঁকেই দেখলে,
তাঁর অন্তরটা আর দেখলে না।
কতবড় অন্যায় করেছো,
বুঝলে নাগো বুঝলে না।"
আহ আপনার রক্ত! আমাদের জন্যই আপনার এতো কষ্ট ছিলো। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি সুন্দর পথ। যে পথে আলো থাকে। মুহাম্মদের দেখানো একটি সাবলীল পথ!
রাসূলুল্লাহ!
আপনাকে আরেকবার দেখার বড্ড শখ। অন্তরের তৃপ্ততা এই শখেই লুকায়িত। চোখ বন্ধ করলেই তায়েফের সে ঘটনা বারবার আমাকে ব্যথিত করে। হাবিব! চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। আমি আপনার ব্যথা গুলো অনুভব করতে পারছি। আমি শুনতে পারছি, আমার চোখের প্রতি ফোঁটা পানি আপনাকে ডাকছে। আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবউল্লাহ!
আমার নবী!
এই গুনাহগার উম্মত অশ্রুভেজা চোখে কাঁপা-কাঁপা হাতে আপনাকে লিখে যাচ্ছে। তার হৃদয়ের গভীরে আপনার জন্য জমে আছে অমেয় ভালোবাসা, তার চোখজোড়া শুধু আপনাকে খুঁজে বেড়ায়, তার হাতের শাহাদাত আঙুল ঐ আসমানের তারাদের মাঝে আপনাকে খুঁজে পায়!
প্রিয়তম ইয়া হাবিবউল্লাহ!
আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন আপনাকে ডাকে।
বিদায় হজ্বে আপনার বলা সে কথাটা আমাকে হারিয়ে দেয় ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। আমার হৃদয়ের কর্ণে বারবার আবৃত্তি হতে থাকে আপনার বলা কথাটি,
"হয়তোবা আগামী বছর এ সময়ে আমি তোমাদের মাঝে থাকবো না।"
আচমকা কেঁদে উঠি। কেন আপনাকে সচক্ষে দেখা হলো না? কেন আপনার মহামূল্যবান কথাগুলো নিজ কানে শুনতে পেলাম না? কেন আপনার সুমধুর তেলাওয়াত এই উম্মতের হৃদয়ে ঢেউয়ের সৃষ্টি করতে পারলো না? কেন আমি আপনার কষ্টগুলো আপন করে নিতে পারলাম না?
আল্লাহর প্রাণের রাসূল!
আজ এতবছর পরও আমার রাসূলকে তারা চিনতে পারলো না। অপমানিত হচ্ছে আমার রাসূলের নামটি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আপনার উম্মতেরা আপন কর্মে সব ভুলে আছে। ভুলে আছে আপনার প্রতি অত্যাচারের কথা। তাদের হৃদয়টা আপনার ত্যাগের কথা স্মরণ করে দিচ্ছে না। হাবিব! তারা মেতে আছে সেসব কর্মে যেসব কর্মের জন্য আপনার এতো বির্সজন। আমি কেন আপনার সময়ে পৃথিবীতে এলাম না? রাসূল আপনার অপমান আমি সহ্য করতে পারছি না। আমিতো আপনাকে ভালোবাসি, বড্ড বেশিই!
ইয়া রাসূলুল্লাহ!
আপনাকে যখন প্রথম দেখবো; তখন হুঁশ হারিয়ে হয়তো আমার সালাম দেওয়া হবে না, বর্ণনা করা হবে না আপনার প্রতি আমার অপরিমেয় মোহাব্বতের কথা। আমি শুধু কাঁদতেই থাকবো। আমার চোখেরা সেদিন আপনাকে দেখার আনন্দে নিজেদের ঠিক রাখতে পারবে না।
প্রিয়তম ইয়া হাবিবউল্লাহ!
আমি আপনার সাথে জান্নাতের আঙিনায় একটা দিন থাকতে চাই। আপনার মনোমুগ্ধকর তেলাওয়াত শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে চাই। জান্নাতের একটি বড় গাছতলায় বসে আমার ভালোবাসা গুলো শুনাতে চাই। শুনাতে শুনাতে যখন আমি কাঁদতে থাকবো; তখন আপনি আম্মিজান আয়িশাহকে ডেকে বলবেন,
"আয়িশাহ দেখো তোমার কন্যা আমাকে কত ভালোবাসে। দেখো আয়িশাহ তোমার কন্যা জান্নাতের মতো এই মনোরম স্থানেও এসেও কাঁদছে। এতো আমার উম্মত! দেখো আয়িশাহ আমার উম্মত আমাকে কতটা ভালোবাসতো। তুমি তাকে বুকে জড়িয়ে নাও, তুমি তাকে তোমার সাথে জান্নাতে রেখে দাও। তোমার তনয়া যে তোমাকেও ভালোবাসে!"
হাবিব! আপনার এই কথাগুলো শুনে সেদিন আমার অন্তর কম্পন শুরু হবে । আমি বিশ্বাস করতে না পেরে আম্মিজানকে জড়িয়ে ধরে বলবো,
"উহিব্বুকি ফিল্লাহ আম্মিজান! ইন্তি হাবিবাতি আম্মি।"
তখন আম্মিজান আমাকে আরো জড়িয়ে ধরে বলবেন,
"বেটি! আহাব্বাকাল্লাযি আহবাবতানি লাহু!
সেদিন জান্নাতের সকল লোকেরা জড়ো হয়ে যাবে। জান্নাতের পাতাগুলো আমাদের অভিবাদন জানাতে শুরু করবে। বাতাসেরা আমাদের ফুল দিয়ে বরণ করবে। আপনি তখন মৃদু হেসে বলবেন,
" তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমার সবসময় একত্রে থেকো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।"
প্রিয়তম হাবিব!
আপনার এই গুনাহগার উম্মত আপনাকে এক পলক দেখবে বলে প্রহর গুনছে, আকাশ পানে আপনাকে খুঁজছে, জান্নাতে আপনার সাথে থাকার স্বপ্ন বুনছে! আপনাকে কতটা ভালোবাসি সেটা বোঝানো আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আমি শুধু এতোটুকুই বলবো, আপনার কথা ভাবলে আমার অন্তর শান্ত হয়ে যায়, আমার চোখ ভিজে পানি গড়াতে থাকে। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, "সালামুন আলাইকুম ইয়া রাসূলুল্লাহ"
প্রিয়তম ইয়া রাসূলুল্লাহ!
আপনার দেখার নেশায় আমার অন্তর মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমি কেবল আপনাকে দেখতে চাই। এই গুনাহগার উম্মত আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে চায়। খোলা আকশের নীচে চিৎকার করে বলতে চায়, "ইয়া হাবিবী! আনা উহিব্বুকা জিদ্দান...

কোন মন্তব্য নেই