মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেমগণের ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেমগণের ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক আলেম মূল্যবান ভূমিকা রেখেছেন। কেউ কেউ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। অনেকে পালিয়ে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে যেতে মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ২৪৩ দিন আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দেন। তার পরামর্শে অসংখ্য মানুষ যুদ্ধে অংশ নেয়। পাকিস্তানী হানাদাররা তার বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়।
হাতিয়ার মাওলানা মোস্তাফিজ, চট্টগ্রামের মাওলানা ছৈয়দ, ছাগল নাইয়ার মাওলানা মাকসুদ প্রমুখের নাম এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। ২৬ মার্চ পাক হানাদারদের গুলিতে প্রাণ হারান ঢাকার হাতিরপুল মসজিদের ইমাম।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইমাম মাওলানা ইরতাজ আলি কাসিমপুরীকে পাকিস্তানী হানাদাররা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। এই ইরতাজ আলি কাসিমপুরীর কথা হুমায়ূন আহমেদ তার বিখ্যাত উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্পে উল্লেখ করেছেন।
নীরবে নিভৃতে বহু আলেম মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। যশোর রেল স্টেশন মাদরাসার মুহতামীম দেওবন্দ ফারেগ মাওলানা আবুল হাসান যশোরীর কথা বলা যায়। তিনি এবং তার মাদরাসার ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন। তার মাদরাসার ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল তার মাদরাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা করে। শহীদ হন ২১ জন। যাদের মধ্যে একজন সম্মানিত আলেম হাবীবুর রহমান, ৫ জন ছাত্র এবং বাকীরা ছিল ওখানে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধা। মাদরাসা প্রাঙ্গনে তাদের কবর রয়েছে। ওই হামলায় যাশোরী গুলিবিদ্ধ হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। পরে ১৯৯৩ সালে যশোরী ইন্তেকাল করেন।
কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসে আজাদের মা সাফিয়া বেগম তার ছেলে আজাদকে পুরান ঢাকার জুরাইনের পীরের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণ করেন। জুরাইনের পীরের আসল নাম ছিল মাওলানা মুহাম্মদ কামরুজ্জামান চিশতী। এই জুরাইনের পীরের বহু মুরীদ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। জুরাইনের পীর সাহেব নিজে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন। (তথ্য সূত্র: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে, লেখক সাংবাদিক শাকের হোসাইন শিবলী)
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পটিয়া মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন পটিয়া মাদরাসার মুহতামীম আল্লামা দানেশ রহমাতুল্লাহ আলাইহি। এ ঘটনা জানতে পেরে পাক বাহিনী নির্বিচারে বোমা হামলা করে। শহীদ হন আল্লামা দানেশ রহমাতুল্লাহ আলাইহিসহ আরো অনেকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের লেখা ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির ৫৪, ৫৫, ১০২ পৃষ্ঠায় এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।
২নং সেক্টরের যোদ্ধা মেজর কামরুল হাসানের লেখা ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’ বইটিতে কুমিল্লার মুরাদনগরের কাশিমপুরের পীর এবং বরিশালের মরহুম চরমোনাইয়ের পীর ইসহাক রহমাতুল্লাহর নাম উল্লেখ করেছেন। যারা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর সর্বশেষ জীবিত খলিফা হাফেজ্জি হুজুর রাহ. মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ সর্ম্পকে তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটা হচ্ছে জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা হচ্ছে জালেম আর আমরা মজলুম। এ রকম বহু আলেম ওলামা পীর মাশায়েখের কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশের প্রকৃত আলেমরা ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে সব সময়। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অনেকটাই অন্তরালে আছে। তাই মুক্তি সংগ্রামে আলেমদের অবস্থান, তাদের বীরত্ব নিয়ে সহিত্যকর্ম হওয়া দরকার। (সূত্র ইনকিলাব ৩ জানুয়ারী ২০১৮)
মুহতারাম মাওলানা কবি মূসা আল-হাফিজ সাহেব একটি অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি দলিল দস্তাবেজ সমেত ইতিহাসের বিবিধ প্রামাণ্য বিষয়কে সামনে এনে বলতে চেয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম তথা আলেমদের অবদান ছিলো বিশাল ও ব্যাপক। এবং এজন্য তিনি একাত্তরের বিভিন্ন পত্র পত্রিকার কাটিং ও অথেনটিক প্রমাণসূত্র সন্নিবেশিত করেছেন তার লেখা ‘মুক্তযুদ্ধ ও জমিয়ত’ বইটিতে।
যারা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের মুখোমুখি এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে দাড়ঁ করাতে চান, তাদেরকে জনাব পিনাকী ভট্টাচার্য সাহেবের ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’ বইটি পড়ার অনুরোধ করব।
এতদিন যারা দাড়ি-টুপিওয়ালা ও আলেম-ওলামাকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধিনতা বিরোধী বলে আখ্যায়িত করল এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের কোন অবদান নেই তারা কেনো করলো, তা একটি বড় জিজ্ঞাসা।
একভাই সুন্দর বলেছেন, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ এর মধ্যে একজনও কলেজের অধ্যাপক নাই। উনসত্তর জন বীরউত্তমের মধ্যে একজনও ডাক্তার নাই। ১৭৫ জন বীরবিক্রমের মধ্যে একজন ইঞ্জিনিয়ার নাই। ৪২৬ জন বীরপ্রতীকের মধ্যে একজনও প্রভাষক নাই!
তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধে কলেজ-ভার্সিটির কোনো অবদান নাই!
চেতনার ফেরিওয়ালাদের কাছে এ সব প্রশ্নের কী উত্তর রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই