পুলিশ অফিসার ও নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহঃ)
মুফতী দিলাওয়ার হুসাইন
ঘটনাটি নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) এর সময়কার। উনার এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলেম। অবশ্য তখনকার যুগে আল্লাহওয়ালা এবং ইলমওয়ালা ব্যক্তিদেরকেই সাধারণত এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করা হতো। নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) এর দরবারে কাওয়ালী হতো অর্থাৎ আল্লাহ্, আল্লাহর রাসূলের এশকে হামদ, নাথ ইত্যাদি গাওয়া হতো। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে এসব অপছন্দীয় আমল ছিল কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটিকে ভুল পন্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রকট এবং বাস্তবেও হয়েছেও তাই। আজকের দিনে যত্তসব ভন্ডদের মারকাজ আছে সব জায়গায় শরীয়ত পরিপন্থী ও হারাম কাজকর্মে লিপ্ত অথচ এগুলোর নাম দিয়েছে কাওয়ালী। কিন্তু নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) এর সময় ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং আল্লাহর এশক, ভালবাসায় ভরপুর। পুলিশ অফিসার (আলেম) সিদ্ধান্ত নিলেন আজকের কাওয়ালী অনুষ্ঠানে গিয়ে চারদিকে টানানো তাবুর কোনাগুলো কেটে দিবেন ফলে অনুষ্ঠানটি আশা করা যায় পন্ড হয়ে যাবে। যথারীতি চারজন কনষ্টেবল চার কোনা থেকে তাবুর দড়ি কেটে দিলেন কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাবুগুলো আপন অবস্থায় রয়ে গেল যেমনটি বাধা অবস্থায় ছিল (!)। পুলিশ অফিসার সবাইকে নিয়ে ফিরে আসলেন। আগামীদিন আবার প্রোগ্রাম রাখলেন তার দরবারে যাবেন। এবার গিয়ে নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) এর পাশে গিয়ে বসলেন। কাওয়ালী শুরু হলো। এক পর্যায়ে হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) আল্লাহ্, আল্লাহর রাসূলের এশক ও মহব্বতে জোশে এসে দাড়িয়ে গেলেন। পুলিশ অফিসার হযরতের হাত ধরে বসিয়ে দিলেন। কিছুক্ষন পর তিনি আবার দাড়িয়ে গেলেন এবারও পুলিশ অফিসার তাকে বসিয়ে দিলেন। কিন্তু তৃতীয়বার যখন দাড়ালেন তখন পুলিশ অফিসার ফিরে আসলেন। এই অদ্ভত ঘটনাগুলোর কারণ জানতে তার অধিনস্থ কনষ্টেবলগুলো পুলিশ অফিসারকে খুব করে ধরলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ
mufti delwar hossain
যখন প্রথমবার তার মজলিশের তাবুর কোনা কেটে দিতে বলেছিলাম তখনতো তোমরা নিজেরাই তার কারামতি দেখতে পেয়েছো যে, ওগুলো কাটার পরও আপন অবস্থায় ঠিক রয়েছে। আজ যা দেখলে তা তোমাদের বাহ্যিক চোখে যা দেখেছো এখানে তারচেয়েও অনেক বেশি কিছু ঘটে গেছে। প্রথমবার যখন তিনি দাড়িয়েছিলেন তখন তার রূহ সপ্তম আসমানে বিচরণ করছিল আমি সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি যদিও তোমরা বাহ্যিক ভাবে দেখেছো দাড়ানো থেকে বসিয়ে দিয়েছি মাত্র। দ্বিতীয়বার যখন দাড়িয়েছে তখন আরশে মোয়াল্লা পর্যন্ত তার রূহ পৌছে গিয়েছিল সেখান থেকে আমি তাকে ফিরিয়ে এনেছি কিন্তু তৃতীয়বার তিনি এমনস্থানে পৌছেছেন যে, সে পর্যন্ত আমার যাওয়ার ক্ষমতা নেই। সুবহানআল্লাহ্ এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় দুজনেই কত উচু মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন (!)।
শেষ জীবনে পুলিশ অফিসার মৃত্যু শয্যায় শায়িত। তার সাথে দেখা করতে এলেন স্বয়ং নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (রহঃ)। খাদেমের নিকট দেখা করার অনুমতি চাইলেন। পুলিশ অফিসার জানিয়ে দিলেন মৃত্যুর পূর্বে কোন বিদাতীর চেহারা দেখে মরতে চাননা। খাদেম বিষয়টি হযরতকে অবহিত করলেন। হযরত নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) বললেন, তাকে গিয়ে বলো আমি আজ থেকে তওবা করতেছি ভবিষ্যতে আর এমন করবোনা। খাদেম ভেতরে গিয়ে কথাগুলো জানালে পুলিশ অফিসার তার মাথার পাগড়ি খুলে দিয়ে বললেনঃ এটা হযরতের জন্য বিছিয়ে দাও যেন হযরত এটার উপর দিয়ে হেটে আসেন। সুবহানআল্লাহ্। একজনের প্রতি আরেকজনের এই শ্রদ্ধা-ভালবাসার নজির দুনিয়াতে বিরল। অথচ একটু আগেও তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল একমাত্র শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অপছন্দীয় আমলের কারণে অথচ উনিও জানতেন যে, নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (রহঃ) কত উচু পর্যায়ের একজন বুজুর্গ।
উল্লেখিত ঘটনার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, উলামায়ে কেরাম যতদিন দুনিয়ার বুকে আছেন ততদিন দুনিয়ার নেজাম ঠিক থাকবে। কারণ তারা সর্বদাই শরীয়তের বিধি-বিধান তথা আইন-কানুনের প্রতি শতভাগ যত্নবান। আজকের দিনে যারা সঠিক পথে চলতে চান তাদের জন্যও ওই একই কাজ করতে হবে উলামায়ে কেরামগণের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখা। দ্বীনের ব্যাপারে তাদের মতামত ও নির্দেশিত পথে চলা। আবেগ কিংবা এশকের দ্বারা কিছু ব্যাপারে বাহ্যিক উন্নতি হয় কিন্তু বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রকট যদি ইলমওয়ালাদের সংস্পর্শ না থাকে। আল্লাহ্ পাক সকলকে হক্কানী আলেমগণের সোহবত আর সংস্পর্শে থাকার তৌফিক দান করুন।


কোন মন্তব্য নেই